[প্রথমবারের মত ছোটগল্পে হাত দিলাম, একটু কি পড়বেন না? বিজ্ঞসমাজের প্রতি আবেদন- কোথাও ঘাটতি খোঁজে পেলে জানাতে ভুলবেন না]
=>>ভূষণের নিন্দন, অতঃপর ভূষিত রমণীর আগমণ<<=
-মুহাম্মদ সৈয়দুল হক
বুঝলি বেলাল, দাড়ি-টুপি-পাগড়ি-জোব্বা এগুলি আসলেই কিছু না। এগুলির কোন মূল্যই আমি দেখি না। অযথা লৌকিকতা, বাড়তি বাড়াবাড়ি! সবকিছুর মুলে হচ্ছে রাসূলে পাকের মুহাব্বত-ভালোবাসা। আল্লাহর রাসূল (দ.) নিজেও বলেছিলেন, ‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমাকে তোমাদের মা-বাবা, সন্তান-সন্তনি থেকে শুরু দুনিয়ার সকল মানুষ, এমনকি নিজের জান থেকেও বেশি ভালো না বাসবে’।
গড়গড় করে কথাগুলি বলে চলছিলো সেলিম। দীর্ঘক্ষণ শোনার পর সেলিমকে খানিকটা থামিয়ে দিয়ে রাসেল বলতে লাগলো- হাঁ, তুই ঠিকই বলেছিস, আমিও বিখ্যাত এক হুজুরের মুখে শুনেছি- ‘পাগড়ি শিখদের পোষাক, টুপি জওহর লাল নেহরুর পোষাক’। জানিস ঐ হুজুর কত বড়?
ঠাট্টার ছলে সায়িদ বলে উঠলো- ‘হাতির মত নাকি মহিষের মত?’ (সায়িদ ছেলেটা আসলেই কেমন যেন। ভীষণ সিরিয়াস ইস্যুতেও তার ঠাট্টার ইস্যুটা কেউ আজো বুঝে উঠতে পারলো না। এইতো সেদিন আবু ভায়ের দোকানের ঘটনা। চলছিলো বাংলাদেশ বনাম ভারতের খেলা। টান-টান উত্তেজনাকর ম্যাচ। জিততে হলে বাংলাদেশের দরকার তিন বলে ছয়। সবার দৃষ্টি টিভির পর্দায়। ঠিক ঐ সময়েই সায়িদ টিভির সুইচটা হঠাৎ অফ করে দিয়ে চেঁচাতে শুরু করলো, ‘হেল্প হেল্প হেল্প! হেএএএএল্প!’ বিরক্ত জনতার মাথা তখন ‘গরমং নস্টং ছদরং ভদরং করকে জ্বলতং!’ এই যেন ছেলেটাকে গিলে খাবে টাইপের ‘এক্সপ্রেশন’। এদিকে সে চেঁচাতেই আছে প্লিজ প্লিজ প্লিজ, হেল্ল্ল্ল্ল্প! ‘আরে কি হয়েছে বলবি তো’- জিজ্ঞেস করলো একজন। ব্যস্ত হয়ে আরেকজন বলে বসলো, ‘টিভিটা অন কর হারামজাদা, নইলে তোরে হেল্পাইয়া দিমু’। করছি করছি, তার আগে আমাকে একটু হেল্প করুন। আমার না, ভিষণ চাপ পড়েছে, আর এদিকে আমার পেন্টের চেইনটা ঠিকটাক কাজ করছে না, ইয়ে মানে খুলছে না। কি যে করি? বাধ্য হয়ে আপনাদের খেলা দেখায় বিঘ্ন ঘটিয়ে হেল্প চাওয়া! সায়িদের এমন অদ্ভুত হেল্প চাওয়ার ভঙ্গি দেখে উপস্থিত জনতার প্রায় সংঙ্গাহীন হওয়ার অবস্থা। কিন্তু যেইমাত্র না ‘খেলা দেখায় বিঘ্ন ঘটিয়ে’ শব্দগুলো মাথায় টুক টুক করে ঢুকলো, তখন সায়িদ বেটা আর যায় কোথায়? সেদিন যে সবাই মিলে সায়িদের কি ধরনের ‘ত্রাহি মধুসূদন’ অবস্থা করেছিলো, তা আজ আর নাই বললাম) ‘আরে রাখতো, তোর সবকিছুতেই ঠাট্টা’- বিরক্তকন্ঠে রাসেলের ধমক! ঐরকম বড়’র কথা বলি নি, আমি বুঝাতে চেয়েছিলাম ওনি অনেক বিখ্যাত। ‘শান্তি টিভি’র নিয়মিত আলোচক ছিলেন কিছুদিন আগেও! এক নিস্বাসে কথাগুলো বলে শেষ করলো রাসেল। আহ!!! কি শান্তি! শান্তি টিভির চেয়েও দুইগণ্ডা বেশি শান্তি! মনের ভেতরের চাপা কথাগুলো উগরে দিতে পেরে মনে হচ্ছে আজ তার ভাবখানা সেই ডাস্টবিনের মতই, যে কিনা এতদিন অনেকগুলো নোংরা আবর্জনা নিজের পেটের মধ্যে আঁটকে রেখেছিলো! ওমমমম শান্তি!
‘আরে জিয়া! আমরা সে কখন থেকে বকবক করে যাচ্ছি, আর তুই কোন কথায় বলছিস না, ব্যাপার কী? ওভাবে হা করে চাঁদের দিকে চেয়ে থাকার কি হলো?’ ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলো সেলিম। ওরা পাঁচজন। সেলিম, বেলাল, রাসেল, সায়িদ আর জিয়া। অন্য সবার চেয়ে আলাদা এরা। খুব ছোটবেলা থেকেই অন্তরঙ্গ বন্ধু। ভাবের আদান-প্রদান একে অপরের সাথে একেবারে ‘গলায় গলায়’। কাউকে ছাড়া কারো পেটের ভাত তো হজম’ই হয় না, বরং এরা দুটা চা’কেও পাঁচজনে মিলে ভাগ করে খায়। প্রতিদিনই সন্ধ্যা হলে স্কুলমাঠে এসে গল্পের আসর বসানোর স্বভাবটা সেই বংশ পরম্পরা থেকেই প্রাপ্ত। আড্ডা চলে ঠিক রাত আট থেকে নটা নাগাদ। আজ দ্বিতীয় জামাদি’র আট তারিখ। আজও তারা সে রীতি অনুস্মরণ করেই গল্পে মেতে উঠেছে। কিন্তু অন্য সবাই গল্পে মেতে উঠলেও জিয়া ছেলেটা কেন জানি একদম চুপচাপ। বাড়ি থেকে আসার সময় হাতে করে যে চানাবুট নিয়ে এসেছিলো, সেগুলি একটা একটা করে মুখগহ্বরে দিচ্ছে। ওখান থেকে জিভ আর দাত তেত্রিশ মহাশয়ের সাহায্যে বেরসিক শুকনো বুটগুলিকে লালায়িত করে অন্তপুরে চালান করছে আর চাঁদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে.....
‘আরে কি ভাবিস এতো? কিছুতো বলবি, নাকি?’- এবার প্রশ্ন বেলালের। নিস্তব্ধ রাতে যেন কেউ পুকুরে একটা ঢিল ছোড়ে মারলো। আর সাথে সাথেই পুকুরের যত মাছ সব হুড়হুড় করে লাফাতে লাগলো। নিরবতা ভেঙ্গে জিয়ার মুখও এবার যেন মাছেদের কলকল শব্দের মতই ফুটলো। সে বলতে লাগলো- ঐ চাঁদটা দেখেছিস? সুন্দর! তবে কি যেন নেই? নাহ্, এই ৮তারিখের অর্ধেক চাঁদটার সাথে কখনোই চৌদ্দ তারিখের পূর্ণচাঁদের তুলনা চলে না। ওটা চাঁদ, আলোও দিচ্ছে, তবু পূর্ণতা নেই। ঘাটতি, এ এক চরম ঘাটতি। আচ্ছা, আজ চৌদ্দ তারিখ হলে কেমন হতো? মাঝখান থেকে আবারো সায়িদের বেখাপ্পা সুর ভেসে আসলো- ‘আজ চৌদ্দ তারিখ হলে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হতো, আর আমরা ব্যাচেলরদের নিন্দনীয় নিরানন্দময় একটা দিন কাটতো’। ‘এবার কিন্তু সবাই মিলে তোরে তাপ্পরবাজি করুম’ খানিকটা ধমকের সুরে সায়িদকে রাসেল।
জিয়া এবার তাকালো সেলিমের দিকে। আচ্ছে সেলিম, মনে কর তোর নাকটা নাই। কেমন লাগবে বলতো? সকলে এবার একযোগে হেসে বললো- ‘ওরে নাককাটা বামুনের মতই লাগবে, হাহাহা!’ জিয়া কিন্তু মোটেও হাসছে না, সে বলে চলেছে- আচ্ছা ধর নাক আছে, কিন্তু হাতের আঙুল অথবা পায়ের আঙুলগুলো নাই! অথবা এগুলোও আছে, কিন্তু তোর কান নাই। অথবা তোর সবি আছে, ছাদের দোষে তোর চুল নাই। সেলিম কিন্তু এতক্ষণে ফুলে ভেতরে ভেতরে বৃহৎ আকৃতির লাউ হয়ে যাবার যোগান। কি বিতশ্রীকর ব্যাপার-সেপার, শেষে কিনা তার নাক-কান-হাত কেটে তাকে খোঁড়া সাজানোর চক্রান্ত চলছে......? ‘এই থাম থাম থাম, আমি অনেক্ষণ ধরে খেয়াল করছি তুই আমার অঙ্গহানি করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিস। ব্যাপার কি বলতো?’- মাথার চুলগুলো ঠিকটাক আছে কিনা চেক করে দেখতে দেখতে সেলিমের প্রশ্ন।
ব্যাপার কিছু নারে ভাই, বলছিলাম কি- ‘এই যে হাত-পা, নাক-কান-চোখ কিংবা চুল এগুলো আসলেই কিছু না। সবকিছুর মুলে হচ্ছে হার্ট অথবা মাথা। ওগুলো থাকলেই হলো। আর কিছু লাগবে না। বাকিগুলো কেবলই বাড়তি বাড়াবাড়ি, অপ্রয়োজনীয় উপাদান।’ এবার বেশ নড়েচড়ে বসে সেলিম। বাকিরাও অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জিয়ার দিকে। জন্মের ‘আনসিরিয়াস ম্যান’ সায়িদকেও বেশ মনোযোগী বলে মনে হচ্ছে। নিরবতা ভাঙলো সেলিম- বলছিস কি আবোল-তাবোল। এগুলো ছাড়া মানুষ অসম্পূর্ণ। একজন পরিপূর্ণ মানুষের এসব থাকা আবশ্যক। ‘কি বলতে চাস, খোলাসা করে বল। এত ঘোরানো-পেঁচানো কথা আমি বুঝি না, সুগারের প্রবলেম আছে।’
আমারো সুগারের খানিকটা প্রবলেম আছে দোস্ত। তোর প্রথম কথাটা শোনার পর থেকে না-আমারও একপাশ বেশ চিনচিন করছে। তুই তো হাদিস শরীফ শোনালি, আমিও কি একটা হাদীস শরীফ শোনাতে পারি? সেলিমকে টপকে দুপা এগিয়ে বসে বেলাল বললো- ‘বল বল’। জিয়ার মুখে আবারো রীতিমতো খৈ ফুটলো- ‘যে আমার সুন্নাতকে ভালোবাসলো, নিঃসন্দেহে সে আমাকেই ভালোবাসলো, আর যে আমাকে ভালোবাসলো, সে আমার সাথেই জান্নাতে থাকবে’, হাঁ এটাও হাদিস কিন্তু। বল তবে রাসূলের ভালোবাসার অর্থ কী? আচ্ছা, ব্যাপার কি বলতো? তুই তো আগে হাতে ঘড়ি পড়তি না কখনো, হটাৎ কদিন ধরে ঘড়ি পড়া শুরু করলি কেন বলতো?- সেলিমকে সন্দেহের প্রশ্ন ছুড়ে দিলো জিয়া। আমতা আমতা করে জবাব দেয় সেলিম- ‘ইয়ে মানে... মানে.....’
কি মানে মানে করছিস, মুখ থেকে মাছরাঙ্গা’র ভূমিকায় ছোঁ মেরে কথা কেড়ে নিয়ে আবারো বলা শুরু করলো জিয়া- ‘তোর গার্লফ্রেন্ড পড়তে বলেছে- এই তো? ওকে বাবু, মাথা নিচু করতে হবে না, ঠিক আছে। তবে দেখ, অবৈধ একটা সম্পর্কের জের ধরে প্রেমিকার কথামতো তার পছন্দের ঘড়িটা হাতে পড়েছিস, যাতে সে খুশি হয়? তবে রাসূলপ্রেমের অর্থ কি হওয়া উচিৎ? নিশ্চয় তাঁর পছন্দের কাজগুলো করা, নাকি? আরে প্রেমতো থাকে মনে, এটা কিছুই না। দে দে, ঘড়িটা আমায় দে। ‘না দোস্ত, এটা দেয়া যাবে না। তার পছন্দ আমার পছন্দ হওয়া মানেই হচ্ছে ভেতরকার প্রেমের বাহ্যিক ‘নিদর্শন’’- বলেই কি যেন ভাবতে শুরু করলো সেলিম। কিন্তু তাকে আর ভাবতে দেয় কে? ঠিক এই মুহুর্তটির জন্যেই তো অপেক্ষা করছিলো জিয়া। তার চোখেমুখে রাজ্যজয়ের আভা খেলা করছে। প্রশ্নকারীর প্রশ্নের জবাব যখন তার মুখ দিয়েই বেরিয়ে যায়, তখন উত্তর দাতার তো ‘আহ্লাদে আটখানা’ হওয়ারই কথা। জিয়া এবার শান্ত। স্বরটা কিছুটা নিচু করে- ‘হাঁ দোস্ত, আমি ঠিক এখানেই থামতে চাই। নিদর্শনে। আর সেই নিদর্শনকে কিনা তুই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করছিস অবলীলায়? জানিস রাসূলে পাক (দ.) কি বলেছেন? ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত হ’তে মুখ ফিরিয়ে নিল, সে আমার দলভুক্ত নয়’- হাঁ, রাসূলে পাকের বাণী এটা। ভাবতে পারিস?
মজলিশ ‘পিন পতন নীরব’। আর কোন সাড়া-শব্দ নেই। সেলিমের চোখে উষ্ণাশ্রু বইছে-যেন সীতাকুণ্ডের উষ্ণপানির ঝর্ণাটি তার চোখে এসে আশ্রয় নিয়েছে। তাকে সান্ত্বনা দেবার প্রয়াসে যেই না রাসেল এগিয়ে আসতে চায়লো, অমনি তাকে থামিয়ে দিয়ে জিয়ার প্রশ্ন- ‘কিরে রাসেল তোর মুখ থেকে সুগন্ধ আসতে খেয়াল করলাম সে অনেক্ষণ আগে থেকেই, ব্যাপার কি? কি খেয়েছিস আজ? ‘ আর বলিস না। বাড়ি থেকে আসার সময় মা ‘কাচ্ছি বিরিয়ানি’ খাইয়ে দিছিলো দুমোটো, কি যে স্বাদ! আ! সেই সাথে সন্দেশটাও বেশ মজার ছিলো। সেটার গন্ধ এখনো রয়ে গেছে।’- স্বাভাবিক সুরেই উত্তর দেয় রাসেল। ‘সে কি! কাচ্ছি বিরিয়ানি তো হিন্দুদের খাবার, সন্দেশও তো বিধর্মীদের খাবার।’ জিয়ার মুখ থেকে এমন অস্বাভাবিক-অযোক্তিক কথাবার্তা শোনে এবার বেশ ক্ষেপে যায় রাসেল- ‘দেখ, এতক্ষণ যা বলেছিস, সব মেনে নিয়েছি, এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে। বিরিয়ানি-সন্দেশ বিধর্মীরা খায় ঠিকাছে, কিন্তু এটা তো ইসলাম ধর্মে হারাম নাই। শরীয়ত মতে পুরোপুরি জায়েয।’
‘ওয়েলডান বয়, ওয়ালডান’। অনেকটা হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে রাসেলকে জিয়ার অভিবাদন। ‘আমি তো ঠিক এটাই বলতে চেয়েছিলাম- কোথাকার কোন শিখ পাগড়ি পড়লো কি পড়লো না, আর কোন নেহেরুই বা টুপি পড়লো কি পড়লো না-সেটাতো আমার দেখার বিষয় না। আমি তো এসব ওদের অনুকরণে পড়ছি না। আমি তো কেবল রাসূলের মোহাব্বতে রাসূলের সুন্নাত বলেই এগুলিকে নিজের ভূষন হিসেবে ধারণ করেছি। আর তুই কিনা ফুলের মধু না দেখে কাঁটার দিকে চোখ দিলি?
শোন তোরা! বিশাল জগতের যতটা না বিশালতা, তার চেয়ে ঢের বিশালতা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে। দেখ না, এক আল্লাহকে কত জনে কত নামে ডাকে! কেউ ইশ্বর, কেউ খোদা, কেউ বিষুঁ, কেউবা ভগবান। মানুষ এমনই। মানুষের মতাদর্শ চিন্তা-ভাবনারও তাই রয়েছে রকমফের। এখন সিদ্ধান্ত তোদের হাতে। তোরা কোনটাকে গ্রহণ করবি? আল্লাহ, নাকি ভগবান? সুন্নাহকে সুন্নাহ, নাকি কে কি বললো তা?
[প্রিয় পাঠক! আপনাদের কাছে লাইক চাই না, গল্পটি পুরো পড়ুন, উপকৃত হবেন-এটুকুই চাই। যদি ইচ্ছে হয়, তো গল্পটি সম্পর্কে আপনার গুরুত্তপূর্ণ মতামত জানাতে ভুলবেন না]
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন