স্মৃতিতে অমলিন আশেকে রাসূল (দ.) আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক শাহ (রহ.)
_মুহাম্মদ সৈয়দুল হক
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
‘‘সরল সঠিক পূণ্যপন্থা মোদেরে দাওগো বলি
চালাও সে পথে, যে পথে তোমার প্রিয়জন গেছে চলি।
যে পথে তোমার চির অভিশাপ, যে পথে ভ্রান্তি চির অনুতাপ
হে মহা চালক! মোদেরে কখোনো করো না সে পথগামী’’
গভীর মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে উপরের পঙক্তি গুলোতে। মহান রাব্বুল আলামিন কতৃক প্রেরিত কুরআনের শেখানো সে ফরিয়াদগুচ্ছ কবির নান্দনিক ছন্দে পড়তে-বলতে ভালোই লাগে। ভালো লাগাটা আরো বহুগুণ বেড়ে যায়, যখন আমরা অনুভব করি কবির ভাষার সে খোদার প্রিয়জনদের কারো কারো সান্নিধ্যে আমরা হায়াতের কিছু অংশ ব্যয় করতে পেরেছি। সঙ্গ পেয়েছি তাঁদের, খোদা তায়ালা যাঁদেরকে ‘‘আনআমতা আলাইহিম’’ বলে পবিত্র কুরআনের শুরুতেই সার্টিফাই করেছেন। তেমন একজন সনদ প্রাপ্ত মহাপুরুষ, মাইজভাণ্ডারি ত্বরিকার অন্যতম সাধক, আশেকে রাসূল (দ.), আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক শাহ (রহ.)। ক্ষণজন্মা এ মনীষী যখন জন্মেছিলেন, তখন না ছিলো আবহাওয়া অনুকুলে, না ছিলো নদীর স্রোত তার গতিপথে। চতুর্দিক ছিলো উত্তপ্ত, সুন্নিয়তের এ ময়দান ছিলো অনেকটা অনুর্বর। আজকের দিনের মতো এত সাজানো গোছানো গিপ্ট পেপারে মোড়ানো সুন্নিয়ত তো ছিলোই না, বরং সুন্নিয়তের এ সরল রাস্তায় ঠিকটাক পা ফেলে চলাটাও ছিলো অনেকটা চ্যালেঞ্জিং। কেননা রাস্তাটা সহজ-সরল হলেও রাস্তার দুপাশে গজে উঠা আগাছা-পরগাছা গুলো পুরো রাস্তাকেই ঘ্রাস করে নেবার মহা আয়োজন করে বসেছিলো এ বাংলায়। ঠিক সে সময়ে যারা খোদা তায়ালার ঘোষিত ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ নামক রাস্তাটার আগাছা গুলো পরিষ্কার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালণ করেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক শাহ (রহ.)। সময়টা ছিলো ১৯৪৩ সাল। গাউছুল আযম মাইজভাণ্ডারি (ক.) এর স্পর্শ্বধন্য ফটিকছড়ি উপজেলার সুয়াবিল গ্রামের এক প্রান্থে তৎকালিন জারিগানের অন্যতম সাধক মুহাম্মদ আদু মিয়া এবং ভাগ্যবতি রমণী মাহমুদা খাতুন এর গৃহ আলোকিত করে জন্ম নিলেন এ মহান ব্যক্তিত্ব।
‘‘জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো’’ এ নীতিতে বিশ্বাসী হয়ে তিনি ছোটকাল থেকেই ছিলেন অত্যান্ত অধ্যাবসায়ী, প্রকট মেধাবী। তাঁর আর এলমে দ্বীনের মধ্যে ছিলো অনেকটা ‘দুধে আলতায়’ সম্পর্ক। যেখানেই দ্বীনের জ্ঞানের চর্চা চলতো, কোন এক চম্বুকীয় শক্তি হুজুরকে সেখানেই পৌঁছে দিতো। এ যেন রাসূলে পাকের সে বাণী, ‘জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজনে তোমরা চীন শহরে যাও’ এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। ‘উতলুবুল ইলমি মিনাল মাহদি ইলাল লাহ্দ’ কে যেন তিনি পুরোপুরি ভাবেই হৃদয়পটে অঙ্কন করে নিয়েছিলেন। সক্রেটিসের বিখ্যাত বাণী, ‘পৃথিবীতে একটিই পূণ্য, তা হচ্ছে জ্ঞান। একটিই পাপ, তা হচ্ছে অজ্ঞতা’ কে সম্ভবত তিনি গভীর ভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। আর তাইতো প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর নাজিরহাট জামেয়া মিল্লিয়া থেকে শুরু করে এশিয়া খ্যাত দ্বীনি শিক্ষা নিকেতন, অনুপম জ্ঞানসমুদ্রের দৃষ্টান্ত জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়ার পাঠ চুকিয়ে একে একে ছারছিনা থেকে কামিল হাদীস, ওয়াজেদিয়া থেকে কামিল ফিকহ্, সর্বশেষ ছিপাতলী আলিয়া থেকে কামিল তাফসীর শেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি ঘটান।
প্রাতিষ্ঠানিক হাতে-কলমে শিক্ষার সমাপ্তি। কিন্তু আরো একটা ধাপ এখনো বাঁকি রয়ে গেলো। বটবৃক্ষ স্বল্প ঢালপালায় সন্তুষ্ট নয়, তাঁর চায় সমৃদ্ধ শাখা-প্রশাকা। অপূর্ণতা নামক দূর্বলতা থেকে সে সর্বদা কয়েক কদম এগিয়ে থাকতে চায়। তাই অপূর্ণতাকে গুডবাই জানিয়ে পরিপূর্ণ হবার লক্ষ্যে হুজুরের এবারের যাত্রা মাইভাণ্ডার দরবার শরীফের দিকে। বিখ্যাত সুফি হযরত জালাল উদ্দীন রুমি (রহ.) তাঁর প্রসিদ্ধ মসনবী শরীফে লিখেছেন,
‘‘এল্মে বাতেন হামসু মছকা, এল্মে জাহের হামসু শির,
কায়বুওয়াদ বে শরীরে মছকা, বায় বুওয়াদ বে পীরে পীর।’’
অর্থাৎ- ‘জাহেরী শিক্ষার জন্য যেমন একজন মাস্টার বা শিক্ষকের কাছে যেতে হয়, তেমনি আত্মাকে এছলাহ্ বা নিজেকে চেনার জন্য একজন আধ্যাত্মিক গুরু বা কামেল পীর-মুর্শিদের নিকট নিজেকে সঁপে দিতে হয়।’
আর তাই বাহির-ভেতর আধ্যাত্মিক রঙে রাঙ্গানোর লক্ষ্যেই তিনি গাউছুল আযম মাইজভাণ্ডারি (ক.) কতৃক খেলাফতের দায়িত্বপ্রাপ্ত খাদেমুল ফোকরা শাহসুফি হযরত দেলাওয়ার হোসাইন মাইজভাণ্ডারি (রহ.)’র নুরানি হাত মোবারকে বায়াত গ্রহণের মাধ্যমেই তিনি নিজেকে পূর্ণতার উচ্চ শিখরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। দস্ত মোবারকে হস্ত রেখে আপন পীরের নিগাহ্ থেকে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ পর্যন্ত বিচ্যুত হন নি। কেন না জ্ঞানেগুণে অদ্বিতীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এ মনীষী এক সময় মাইজভাণ্ডার শরীফের দারুত্ত্বালিমের অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন এবং আমৃত্যু এ পদেই অতিবাহিত করেন। তরিকত চর্চার পাশাপাশি সেখানে গড়ে তুলেছিলেন দেশ-বিদেশ থেকে সংগ্রহকৃত কিতাবাদি সমৃদ্ধ বিশাল লাইব্রেরি, যা আজো হোসাইনিয়া গ্রন্থাগার নামে দণ্ডায়মান।
নবীপ্রেমের অতুল দৃষ্টান্ত এ মনীষীর জীবন এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। রাত জেগে রিয়াজতের মধ্যে কখনো বিরতি ছিলো না। সারা দিনে ঘুম ছিলো মোটে কয়েক ঘন্টা। ব্যাপারটা এমন যেন, তিনি ঘুমোতে আসেন নি বরং ঘুমিয়ে পড়া সুন্নিয়ের সুপ্ত তারকা গুলোকে জাগিয়ে দিতে এসেছেন। রাতভর ডিউটি ছিলো বিভিন্ন স্থানে মাহফিল, মিলাদ-কিয়াম, মোনাজাত, দরবার শরীফের সান্নিধ্যে, সবশেষ একাগ্রচিত্ত্বে মাওলার রিয়াজত। নবীজির শান-মানের আলোচনায় তাঁর চক্ষুদ্বয় যেমনি ভাবে নবীপ্রেমের স্রোত বয়ে দিতো, যেমনি ভাবে নাতে রাসূল (দ.) পাঠকালে চোখজোড়া দিয়ে অনর্গল ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হতো, তেমনি কখনো কোথাও নবীজির শানে-মানে কটুক্তি হলেও ছিলেন নিয়মিত অগ্নিশর্মা। জীবনভর তাই বহু মোনাজেরায় নবীপ্রেমের হঙ্কার ছেড়ে বাতিলদের পরাজিত করে সুন্নিয়তের বিজয় নিশান উড্ডয়ন করেছিলেন। মাঠে-ময়দানের অবদানই কেবল নয়, কলমি অবদানেও বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পবিত্র কুরআন ও পবিত্র বোখারি শরীফের অনুস্মরণে, ‘মজমুয়ায়ে সালাওয়াতে রাসূল (দ.)’ হতে উদ্বুদ্ধ হয়ে শানে মোস্তফার উপর উর্দূ ভাষায় লিখেছেন ৩০ খণ্ড সম্বলিত বিশাল এক গ্রন্থ। আর্থিক জঠিলতা আর অনুবাদ না হওয়ায় যা এখনো প্রকাশ করা সম্ভব হয় নি। এ ছাড়াও তিনি জীবদ্দশায় বিভিন্ন মেগাজিনের নিয়মিত লেখক ছিলেন।
হাবিবে খোদা নবীয়ে দুজাহা কতৃক ঘোষিত ‘আখেরাতের সম্পদ এলমে দ্বীন’ শিখেই থেমে যান নি। সময় গড়ানোর সাথে সাথে তা নিজ গুণে অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ৩৭ বছরের কর্মজীবনে মোট চারটি মাদরাসায় কৃতিত্ব আর খ্যাতির সাথে পাঠদান করিয়েছিন। সবার প্রিয় ‘শাহ সাহেব’ হুজুর শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে কার্পন্য করেছেন, এমন হদিস কোথাও পাওয়া যায় নি আজ অবদি। দ্বীন শেখানোর এই মিশনে প্রথমেই যেখান থেকে বিদ্যা অর্জন শুরু করেছিলেন, সেখান থেকেই বিদ্যা বিতরন শুরু করলেন ‘সহকারি মাওলানা’ পদে নিযুক্ত হয়ে। এরপর পেশকারহাট গুমানমর্দন সুন্নিয়ায় প্রিন্সিপাল, ছিপাতলী গাউছিয়া মুঈনীয়া আলিয়ায় দীর্ঘ ১৭ বছর ফিকহ বিভাগের প্রধান, সর্বশেষ চট্টগ্রাম বায়েজিদস্থ আহসানুল উলুম গাউছিয়ায় প্রধান মোহাদ্দিস পদে আমৃত্যু নিযুক্ত থেকে জীবনাবসান ঘটান।
উল্লেখ্য যে, হুজুর আল্লামা আবদুল মালেক শাহ্ সাহেব (রহ.) ছিলেন যুগের অন্যতম আশেকে রাসূল (দ.)। এ কথা সর্বজন বিদীত যে, হুজুরের অন্তর ছিলো নবীপ্রেমের অনন্ত এক সমুদ্র। সমসাময়িক প্রখ্যাত আলেমেদ্বীনরা এক বাক্যে এ কথা নির্ধিদায় মানতে বাধ্য যে, হুজুর শুধুমাত্র শরীয়তের একজন বড় আলেম ছিলেন তা নয়, বরং তরিকতের মহান ব্যক্তিত্ব, রিয়াজতে অতুলনীয়, আপাদমস্তক সুন্নাতে রাসূলের পাবন্দি, শরীয়তের আদেশ-নিষেধের আক্ষরিক অর্থে পূর্ণাঙ্গ অনুস্মরণে ছিলেন বিরল দৃষ্টান্ত। সময় তাঁর আপন গতিতেই চলমান। উপাত্যকা কিংবা পাহাড়ের পাদদেশ থেকে নির্গত হওয়া নদীর বিনাস সমুদ্রে। পরকালিন বিশাল জীবনকে যদি প্রশান্ত মহাসাগর ধরা হয়, তবে ইহকালিন এ জীবন ক্ষুদ্র কর্ণফুলি। দিনভর উত্তাপ ছড়ানো সূর্যটাও এক সময় ক্লান্তি নিয়ে সন্ধ্যার আকাশে ধীরে ধীরে ডুবে যায়। চিরসত্য সে ‘কুল্লু নাফসিন যা-ইকাতুল মাউত’ নিয়মেই সময় ঘনিয়ে এলো ২০০৬ সালে। যাঁর সারাটা জীবন সুন্নাতে রাসূলের পূর্ণাঙ্গ অনুস্মরণে কেটেছে, অন্তিমলগ্নেও তা আর বেশকম হবে কেন? সুন্নাতি হায়াত শেষে ঠিক ৬৩ বছর বয়সেই কলকাতা হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় কালের এ সূর্যসন্তান ইহকাল ত্যাগ করে মাওলার সান্নিধ্যে চলে যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজ্বিউন। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদেরকে হুজুরের জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নবীপ্রেমে নিজেদের জীবনকে রাঙ্গানোর তাওফিক দান করুন। আমিন! বেহুরমাতি সায়্যিদিল মুরসালিন।
পূনশ্চঃ আগামীকাল ২৯-১২-১৭ জুমাবার হুজুরের বার্ষিক উরস শরীফ। সবান্ধবে যোগদান করুন।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন