এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো....
না। যতই গান ধরুন বা আশায় বুক বাঁধুন না কেন, পথ কিন্তু শেষ না হয়ে ছাড়বে না। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে পুরো আধকিলোমিটার পথ অতিক্রম করে ফেললাম, ঠেরই পেলাম না। গোরস্থান পেরিয়েই বিরাট মাঠ। করিম মোল্লার বাড়ি মাঠের পাশেই। এককোণে। আমরা ওখানেই পৌঁছে গেছি। বিশাল আয়োজন! পুরো মাঠজুড়ে প্যাণ্ডেল। একপাশে বিরাট মঞ্চ। আরেকপাশে সারি সারি গরু-মহিশ-বকরি বাঁধা। বিশ-পঁচিশটার কম হবে না। রেযা বললো পুরো বিশেক জবেহ হওয়ার পরে এগুলো অবশিষ্ট। সে কিভাবে জানলো, সেটা আর জানা হলো না। মাঠের ঠিক পরে বিশাল বিলজুড়ে মেলা বসেছে। স্বাধীনতা কিংবা বৈশাখী মেলার আদলেই। লোকে-লোকারণ্য! করিম মোল্লা লোকটা অত ধনাঢ্য ছিলো না। এখন দেখি পাকা বাড়িও করেছে। রেযা ইশারা করে ওটাই আমাকে দেখাচ্ছে। বছর দুয়েকের মধ্যে এ বিশাল আয়োজন তার দ্বারা কিভাবে সম্ভব হয়ে উঠলো সে ব্যাপারে মনে খটকা লেগে গেলো। আবার ধাঁধা! আপাতত কিছু বলার আগেই রেযার বলে উঠলো-
‘চল, করিম মোল্লার সাথে দেখা করে আসি।’
আমিও এগোলাম। লোকটা আমায় স্নেহ করত কিনা! ঘরে ঢুকতেই দেখি করিম মোল্লা আসন পেতে বসে আছে। লোকেরা চারিদিকে ঘিরে আছে। নানান জন নানান অজুহাত-মান্নত নিয়ে এসেছে। করিম মোল্লা কাউকে তাবিজ দেয় তো, কাউকে ঝাঁড়ফুঁক! মুখে কি যেন বিড়বিড় করে পড়ে আর ফুঁক দেয়। বিনিময়ে লোকেরা মোটা অঙ্কের হাদিয়া পকেটে পুরে দিচ্ছে। গলায় রকমারি ডিজাইনের তাসবির মালা। রেযাকে দেখেই বলে উঠলো- ‘বাবা রেযা! এসেছো? সাথে ওটা..... আরররে, ছোকড়াআআ! তুই কখন এলি?’ (আদতে আমি ‘ছোকড়া’ নই, ইরফান। ইরফানুল হক জিহাদ। ‘ছোকড়া’ করিম মোল্লার দেওয়া নাম। ছোটবেলা থেকে আদর করে ডাকে)
‘জি, কাকু এইতো কাল। রেযার মুখে শুনলাম আজ নাকি উরস, তাই সাথে চলে এলাম’--আমি জবাব দিলাম।
-বেশ করেছো বাবা! বেশ করেছো! শহরে গিয়ে তো আমাদের ভুলেই গেলে। যাবার পর থেকে আর কোন খবর-টবর পেলাম না।
-কি যে বলেন চাচা, শহরটা ব্যস্ততম সূর্যের ন্যায়। কোন অবকাশ পেয়ে উঠি না। আমার মত মধ্যবিত্ত ছেলে হলে তো কথায় নেই। কি পরিমাণ সংগ্রাম করে যে ওখানে বেঁচে থাকতে হয়, তা আর বলে বুঝানো যাবে না। তাই আর আপনাদের খবর নিয়ে উঠতে পারি নি। তো চাচা ভালো আছেন?
-আছি বাবা, আছি। এই দেখ, সে কখন থেকে দাঁড় করিয়ে রেখে বকবক করছি, বোসো বোসো। এই কে আছিস, রেযা আর ছোকড়াকে চা দে।
আমরা বসে পড়লাম। পাশ থেকে জটাচুল ওয়ালা একলোক চা এগিয়ে দিলো। লোকটার গায়ে একটা লাল পাঞ্জাবী। করিম মোল্লা একসময় লালজামা পড়তে আমাকে নিষেধ করতো, এখন দেখি তার অনেক ভক্তের গায়েই লালজামা! এ ব্যাপারটাও ঠিক বুঝলাম না। ধাঁধা! চা’য়ে চুমুক দিতে দিতে ভাবছি, মোল্লাজির আঙুল ফুলে কলাগাছ হবার হেতু কিছুটা বোধয় উদ্ধার করতে পেরেছি.................
চলবে.....
নবাবপুরের হালচাল-৫
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন